প্রাককথন

আমি প্রথম যে কোম্পানিতে চাকরি করি সেটির পরিবেশ খুবই টক্সিক ছিল। সে ২০০৪ সালের কথা। প্রথম চাকরি হওয়ায় অনেক কিছুই তখন বুঝতাম না, যেহেতু অন্য কোম্পানির সাথে কম্পেয়ার করার মত অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। তবে এটুকু বুঝতাম ব্যাপারগুলো ঠিক স্বাভাবিক না। যেমন প্রজেক্ট ম্যানেজার বা টিম লিডরা রুমের মধ্যে ঘুরঘুর করতেন, আমাদের চেয়ারের পেছনে এসে দাঁড়িয়ে থাকতেন দেখার জন্যে কাজ করছি নাকি নেট ব্রাউজ করছি। অথবা টিম মিটিং এ ইঞ্জিনিয়ারদের ছোটখাট ভুলের জন্যে সবার সামনে অপমান করা হতো, এবং সেটা ভুক্তভোগী ব্যক্তিকে হাসিমুখে সহ্য করে যেতে হত। কোন বিষয়েই জুনিয়রদের কোন say ছিল না, সিনিয়ররা ভুল টেকনিক্যাল সলিউশন দিলেও সেটি চুপচাপ মেনে নিতে হত। এমন আরো অনেক কিছু। কিছু বলতে গেলেই তাদের এক কথা – আমরা CMMI Level 3 আর তাই এগুলো আমাদের স্ট্রিক্ট প্রসেসের অংশ।


Why is this post in Bengali?
This post is primarily targeted to the Bengali-speaking audience who wants to develop their career in HR management and avoid common mistakes to become successful managers.

 
নেদারল্যান্ডস ভিত্তিক কোম্পানিটা ষোল বছরের পরিক্রমায় এখন কোনমতে টিকে আছে। মার্কেটে তাদের আর কোন নামডাক নাই। এর মূল কারণ কোম্পানি কালচার বলতে ওদের কখনো কিছু ছিল না। তখন থেকেই আমার মধ্যে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিলো যে একটা প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রাখতে পারে এটির কালচার। টেক কোম্পানিগুলোর জন্যে এটি আরো অনেক বেশি প্রযোজ্য।

টক্সিক কালচার একটা সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দেয়। আবার প্রোএক্টিভ কালচার একটা কোম্পানিকে শূন্য থেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। কালচারাল পলিসিগুলো তৈরি করার দায়িত্ব কিন্তু কর্তৃপক্ষের। বা ম্যানেজমেন্টের। আপনি আধুনিক ও ভাল বস হলে আপনার কোম্পানিও হবে আধুনিক ও ভাল। আর “খ্যাত” বা খারুস বস হলে কোম্পানিও হবে সেরকমই।

যেকোন লেভেলের একজন ম্যানেজার ভাল কি না সেটি বের করার পদ্ধতি নিয়ে বিশ্বে প্রচুর গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে। গুগলসহ আরো অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান তাদের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে দশ পয়েন্টের একটা মানদন্ড তৈরি করেছে। মজার বিষয় হচ্ছে, গবেষণায় দেখা গেছে একজন ম্যানেজারের টেকনিক্যাল স্কিল থাকার চেয়েও বহুগুণ জরুরী হচ্ছে তার ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের উপস্থিতি। বিশেষ করে নিজের ও অন্যের আবেগ বুঝতে পারা ও নিয়ন্ত্রণে রাখার দক্ষতাটাই এখানে সবচেয়ে মুখ্য।

চলুন দেখি ভাল ম্যানেজার বা বস হবার দশটা লক্ষণ কি কি।

১/ আপনাকে ভাল শিক্ষক বা কোচ হতে হবে।

প্রতিদিন আপনার টিমে নানান সমস্যা বা চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে। সেগুলোকে দ্রুততম সময়ে সমাধানের প্রেশার না দিয়ে, বরং সে সময়গুলোকে কাজ শেখানোর মোক্ষম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে নিন। আপনি যদি ধৈর্য নিয়ে টিম মেম্বারদের শেখান কেন সমস্যাগুলো হলো, কিভাবে এটিকে সুন্দর করে সমাধান করা যাবে, কি করলে এটি আর হবে না – আপনি একজন ভাল ম্যানেজার।

২/ মাইক্রোম্যানেজ করা যাবে না।

আপনি যদি চেইন অফ কমান্ড বা লিডারশিপ হায়ারার্কির তোয়াক্কা না করে আপনার টিম মেম্বারদের ডেস্কে যেয়ে যেয়ে ওদের আটকে থাকা কাজ করে দিয়ে থাকেন বা আপনার সিদ্ধান্তগুলো ওদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে থাকেন, এই ভেবে যে ওরা আপনার মত দক্ষ না – তাহলে অচিরেই ওরা মানসিকভাবে আপনার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পরবে।

একজন ভাল ম্যানেজার কখনই এমন করবে না। উলটো তারা এমপ্লয়িদের নানাধরনের স্বাধীনতা দেবে – যেন তারা তাদের আইডিয়াগুলো এক্সপ্লোর করতে পারে, প্রয়োজনে স্মার্ট রিস্ক নিতে পারে, এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভুলও করতে পারে। একজন ভাল ম্যানেজার জানে ও মানে যে মানুষ ভুল করতে করতেই শেখে।

৩/ মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা ও প্রশান্তি দিতে হবে।

একজন লিডার হিসেবে আপনার আচরণে যদি ধরা পরে যে আপনি দুয়েকজনের প্রতি বিশেষভাবে পক্ষপাতদুষ্ট, তবে অন্যরা কষ্ট পাবে, এবং একসময় পুরো পরিবেশটাই নষ্ট হয়ে যাবে। গ্রুপিং সৃষ্টি হবে, এবং অফিস পলিটিক্স তার বিষাক্ত থাবা মেলবে। বরং আপনার আচরণে প্রকাশ পেতে হবে যে আপনি সবার ভাল থাকা ও করার ব্যাপারে সমানভাবে উদগ্রীব।

গুগলের এক গবেষণায় দেখা গেছে টিম পারফর্ম্যান্স বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হচ্ছে একটা সাইকোলজিক্যালি সেইফ এনভায়রনমেন্ট তৈরি করতে পারা। আপনার টিমের সবাই যদি এই ভেবে নিরাপদ ও আত্মবিশ্বাসবোধ করে যে – ভুল স্বীকার করলে, বা মিটিং-এর মাঝে প্রশ্ন করলে, বা নতুন কোন আইডিয়া অফার করলে – তাদের হেয় করা হবে না, তাহলে তারা ভাল করবেই।

৪/ প্রোডাক্টিভ ও রেজাল্ট-ওরিয়েন্টেড হওয়া জরুরী।

আপনি যদি আনরিয়েলিস্টিক ডেডলাইন সেট করে থাকেন – বিশাল সমস্যা।

টিম ডেলিভারি মিস করছে, পুরো চেইনের কোথাও কোন সমস্যা আছে, আপনি সেটি খুঁজে বের না করে, পুরো টিমের ওপর চোটপাট করছেন – বিশাল সমস্যা।

টিম খুব ভাল করছে, বেশি প্রশংসা করলে ওরা মাথায় উঠে যাবে, এইভেবে আপনি যথাযথ প্রশংসা করেন না, অথবা সামান্য কিছু টাকা বাঁচানোর জন্যে ইভেন্ট বা পার্টি আয়োজন করেন না – বিশাল সমস্যা।

কেউ একটা টেকনিক্যাল সমস্যায় পরেছে, যেটার পথ আপনি খুব সহজেই বাতলে দিতে পারেন, কিন্তু বস হওয়ায় সেটি করবেন না, উলটো হম্বিতম্বি করবেন – বিশাল সমস্যা।

এগুলো বদলাতে হবে।

৫/ কমিউনিকেশন স্কিল সেরা স্কিল।

সেরা ম্যানেজাররা ভাল শ্রোতা হয়ে থাকে। তারা বলে কম, শোনে গভীরভাবে। তারা বোঝার চেষ্টা করে অন্যরা কি বলছে, কেন বলছে। যখন কথা বলে, তখন সলিড এবং ইফেক্টিভলি বলে। জোর করে নিজের মতামত চাপিয়ে দেয় না।

ভাল ম্যানেজার হতে হলে নলেজ-শেয়ারিং এর গুরুত্বও বুঝতে হবে। একটা নলেজ-ড্রিভেন এনভায়রনমেন্ট টিম পারফর্ম্যান্স বাড়িয়ে দেয় অনেকখানি।

৬/ এমপ্লয়িদের সাথে তাদের পারফর্ম্যান্স নিয়ে আলাপ করুন।

ধরুন, আপনার এক এমপ্লয়ির বাৎসরিক রিভিউ মিটিং আছে। এবং তার সার্বিক পারফর্ম্যান্স ভাল না, তাই রিভিউ ফিডব্যাক আপনি খারাপ দেবেন, এবং তার ইনক্রিমেন্ট কম হবে। সে যে ভাল করছে না, পুরো বছর আপনি তাকে অফিসিয়ালি জানাননি, এখন ফাইনাল রিভিউর দিন যদি আপনি হুট করে তাকে বলেন – এই এই কারনে তার বেতন বাড়বে না, তাহলে কিন্তু সে ভাল করার সুযোগ পেল না।

আসল কথা হচ্ছে – একজন ম্যানেজার হিসেবে আপনাকে আপনার এমপ্লয়িদের ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্টে সাহায্য করতে হবে। সারাবছর জুড়ে ফিডব্যাক দেবেন যেন তারা প্রতিনিয়ত ভুলগুলো শুধরে আরো ভাল করতে পারে।

আপনি যদি ভেবে থাকেন একজন এমপ্লয়ি বেশি ভাল হয়ে গেলে চাকরি বদলে বেটার কোথাও সুইচ করে যাবে, তাই বেশি কিছু না বলাই ভাল – তাহলে মারাত্নক ভুল করছেন।

ব্যাপারটা শুধু আপনার অফিসের লক্ষপুরণের জন্য নয়। একজন টিম মেম্বারের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার গোল কি জানুন, এবং সেটা অর্জনে সাহায্য করুন।

ভাল কাজে প্রশংসা করুন। মন্দ কাজে তিরস্কার করুন, তবে রুঢ়ভাবে নয়। প্রফেশনালি।

৭/ সার্বিকভাবে পুরো টিমের ওপর স্বচ্ছ ধারণা রাখুন।

এক হাতের পাঁচ আঙ্গুল সমান হয় না। আপনার দলের কেউ দুর্বল হবে, আর কেউ অনেক ভাল। এটিই স্বাভাবিক। এটি মেনে নিয়ে একটা ইফেক্টিভ স্ট্র্যাটেজি বানান। কার রোল কি ভাল মত বুঝিয়ে দিন। যে যার রোল ঠিক মত পালন করতে পারছে কি না নিশ্চিত করুন। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কে কোথায় আছে, ভাল ধারণা রাখুন। কেউ পিছিয়ে পরলে, বা কোন সমস্যা হলে, মাথা ঠান্ডা রাখুন।

যেকোন প্রজেক্টে একটা “প্ল্যান বি” রেডি রাখলে বিপদের সময় সেটি খুবই কাজে দেয়।

৮/ আপনার কাজের জন্য প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল স্কিল কি আপনার আছে?

ধরা যাক, আপনি একজন ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার। অর্থাৎ আপনি প্রোগ্রামারদের একটা দল চালান। সেখানে ব্রিলিয়ান্ট কিছু প্রোগ্রামার আছে। কিন্তু আপনি নিজেই টেকনিক্যালি বেশ দুর্বল। লেটেস্ট কিছু জানেন না, পড়াশোনা করে নিজেকে আপডেটও করেন না। কি কি ঘটবে বলিঃ

১/ টিম মেম্বাররা কোথাও আটকে গেলে সাহায্য করতে পারবেন না
২/ তাদের কাজের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারবেন না
৩/ ভুল ধরতে পারবেন না
৪/ আনরিয়েলিস্টিক ডেডলাইন সেট করবেন
৫/ কোয়ালিটি বজায় রাখতে কোন ইনপুট দিতে পারবেন না
৬/ সমস্যার সময় কাদা ছোড়াছুড়ি করবেন
৭/ ভাল টিম মেম্বাররা হতাশ হয়ে সুইচ করে চলে যাবে

যেই পেশারই হোন না কেন, আপনার ডোমেইনের ইন-ডেপথ স্কিল যদি আপনার থাকে, এবং নতুন তথ্য শিখে নিজেকে প্রতিনিয়ত আপডেটেড রাখেন – আপনি একজন সেরা ম্যানেজার।

৯/ “বিগ পিকচার” টা দেখুন।

কিছু কিছু ম্যানেজার আছে যারা সবসময় নিজের দলকে মনে করে সেরা, আর অন্যদের শত্রু। আমি এক QA Testing টিম লিড-কে চিনি, যার কাছে কোডার মানেই বাগ তৈরির কারখানা। তার কাজই ছিল কথায় কথায় ডেভেলপমেন্ট টিমকে অপদস্থ করা।

এরা আসলে বোঝে না যে সব দলই কোম্পানির স্বার্থে কাজ করছে, এবং সব দলের মধ্যে সামঞ্জস্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা থাকাটা অত্যাবশ্যক।

১০/ আপনি কি সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?

দিন শেষে সিদ্ধান্তটা আপনাকেই নিতে হবে। আত্মবিশ্বাসহীনতা, সিদ্ধান্তহীনতা ভাল ম্যানেজার হবার পথে অন্তরায়। কনফিউজড থাকা যাবে না।

ফ্যাক্টস জানুন, স্বচ্ছ চিন্তা করুন, সব পরিস্থিতি বিবেচনা করে সঠিক সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিন। তাতে যদি কেউ অখুশিও হয়, হোক। কোম্পানির ভাল হলেই হলো।

মনে রাখবেন, কখনই সবাইকে খুশি করা সম্ভব না। বৃহত্তর স্বার্থে দরকারি কিন্তু অপ্রীতিকর সিদ্ধান্ত নিতে বুক কাঁপা চলবে না।

সবাই ভাল থাকবেন।


লেখকঃ হাসনাইন রিজভী রহমান
সিইও, আস্থা আইটি ভেঞ্চারস
http://hasnaeen.me
https://www.linkedin.com/in/hrrahman


ভাল আর খারাপ ম্যানেজারের মূল পার্থক্য এখানেই, এভাবেই!
Facebook Comments
SHARE ON SOCIAL MEDIA