সাত মাস হয়ে গেছে রবিন স্বনামধন্য একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করে বেরিয়েছে। স্কুলজীবন থেকেই আশা ছিলো কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ার, তাই কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্ন বিষয়ে সুযোগ পেয়েও সে বেছে নিয়েছিলো একটা ব্যয়বহুল প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখান থেকে সে অর্জন করেছে কম্পিউটার সায়েন্সে উপর বিএসসি ডিগ্রী। রেজাল্টও শেষপর্যন্ত খারাপ হয়নি, সিজিপিএ ৩.৫৫। ভেবেছিল পাশ করেই সে বিভিন্ন কোম্পানি থেকে ডাক পাবে, এবং দুর্দান্ত কোথাও চাকরি পেয়ে তার প্রোগ্রামার হবার স্বপ্নের ক্যারিয়ার চালু করে দিবে।


Why is this post in Bengali?
This post is primarily targeted to the youth of Bangladesh who has a degree in computer science, but lacks the skills necessary for getting hired in the tech industry.

 
আজ সাত মাস পর রবিন যত না হতাশ, তার থেকেও বেশি ভয়ার্ত। এই সময়ের মধ্যে সে কোন চাকরি যোগাড় করতে পারেনি। অনেক চেষ্টা-তদবীর করে ৩-৪টা ইন্টারভিউর সুযোগ পেয়েছিলো বটে, কিন্তু সেগুলোতে প্রথম ধাপেই বাদ পরে গেছে। রবিন বুঝতে পারছে না সমস্যাটা কোথায়! ছাত্রাবস্থায় সে খুবই মনযোগী ছিল, সব কোর্সেই মোটামোটি ভাল গ্রেড পেয়ে শিক্ষকদের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিল সে। তবে এটা সত্য যে কোর্সওয়ার্কের বাইরে বাড়তি তেমন কিছু সে করেনি। যেমন ব্যক্তিগত প্রোজেক্ট বা প্রোগ্রামিং কনটেস্ট। তাই প্রোগ্রামিং-এ দুর্বলতাটা একটু রয়েই গেছে।

কিন্তু রবিন আত্মবিশ্বাসী ছিল একটা সুযোগ পেলে সে দ্রুত কাজ শিখে নিতে পারবে। দুঃখের বিষয় এই যে, সেই সুযোগটাই কোথাও পাচ্ছে না সে।

আমাদের দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই রবিনদের সংখ্যা কিন্তু নেহায়েত কম না। দেশে এখন শতশত ইউনিভার্সিটি, যেখান থেকে প্রতি বছর পাশ করে বের হয় কয়েক হাজার গ্র্যাজুয়েট। হ্যা আমাদের টেক ইন্ডাস্ট্রি বড় হয়েছে সত্য, কর্মীদের চাহিদাও বেড়েছে কয়েকগুণ কিন্তু ডিমান্ডের তুলনায় সাপ্লাই এখনো বেশিই রয়ে গেছে। তাই কোম্পানিগুলো অনেকের মধ্য থেকে সেরাদেরকেই বেছে নিতে চায়।

আমাদের কোম্পানিতেই প্রতিদিন গড়ে ৩টি করে ইমেইল আসে ইন্টার্নশিপের জন্যে আবেদন করে।
বিডিজবসের মত জবসাইটগুলোতে চাকরির বিজ্ঞাপন দিলে, প্রতিটি পদের জন্যে গড়ে অ্যাপ্লিকেশন পরে ২০০০টির মত!

 
এরা মূলত ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট, এদের চাওয়া কাজ শেখার একটা মাত্র সুযোগ। কিন্তু বাস্তবতার প্রেক্ষিতেই এদের সবাইকে “সেই সুযোগ” দেয়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না।

এই সমস্যার পেছনের মূল কারন হলো – ফ্রেশারদের ভিশন শুরুতে একটু ঘোলাটে থাকে। কি ধরণের কেরিয়ার পথ বেছে নেবে তা নিয়ে তারা তাদের ইউনিভার্সিটি থেকে কোন যথাযথ দিকনির্দেশনা পায়না।

  • আমি কি প্রোগ্রামার হবো?
  • নাকি গ্রাফিক্স ডিজাইনার?
  • নাকি টেস্টার?
  • প্রোগ্রামার হলে, কোন প্ল্যাটফর্মে কাজ করবো? ব্যাকএন্ড, ফ্রন্টএন্ড, নাকি মোবাইল অ্যাপস?
  • ব্যাকএন্ড হলে কোনটা শিখবো? C++, PHP, জাভা, নাকি .NET? নাকি অন্যকিছু?

 
দেখা যাচ্ছে, এই “চয়েস” গুলোর সংখ্যা অনেক বেশি, আর যত বেশি চয়েস তত বেশি কনফিউশন!

এই পোস্টে তরুণ ফ্রেশারদের জন্য কিছু দিকনির্দেশনা থাকলো, যা অনুসরণ করলে তথ্যপ্রযুক্তিকর্মী হিসেবে চাকরি পাওয়া সহজ হবে।

১) কর্মক্ষেত্র হলো কাজের জায়গা, আর শেখার জায়গা হচ্ছে ইউনিভার্সিটি

আমি অবাক হয়ে যাই যখন দেখি দেশের সকল ছাত্রছাত্রীদের একটা বড় অংশ বিশ্বাস করে পড়ালেখার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ভাল রেজাল্ট করা। কিন্তু এই “ভাল রেজাল্ট” করে কি হবে সেটার ব্যাপারে তাদের স্বচ্ছ কোন ধারণা নেই।

তোমাদের জন্য বলছি – পড়ালেখার একটাই উদ্দেশ্য, আর সেটা হচ্ছে শেখা বা জ্ঞান অর্জন করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি বছর শুধু মাত্রই শেখার জন্যে, আর কিছু না। এই সময়টা যথাযথ ভাবে শেখার পেছনে ব্যয় করলে রেজাল্টও যেমন ভাল হবে, তেমনি পাশ করার সাথে সাথে চাকরির সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে বহুগুণ।

আমার নিজের ব্যাচমেটদের মধ্যেই এমনও শিক্ষার্থী ছিলো যার সিজিপিএ ৩.৯৫ কিন্তু সে একটা সহজ প্রোগ্রামও লিখতে পারতো না। এই সিজিপিএর কোন দাম নেই।

আবার অনেক শিক্ষার্থীই তাদের শিখতে না পারার কারন হিসেবে শিক্ষকদের ওপর দোষ চাপায়।

  • অমুক স্যার কি প্রোগ্রামিং শেখাবে, উনি নিজেই তো পারে না।
  • তমুক স্যার এলগোরিদম শেখাবে কি, উনার কথাই তো কিছু বুঝি না…

 
আমরা দোষ দিয়ে যেতেই পারি, তাতে আসলে আমাদের কোন উপকার হবে না। পিছিয়ে পরবো আমরাই। কোন শিক্ষক তার কোর্স ইফেক্টিভ ভাবে নিতে না পারলে নিজেদের চেষ্টাতেই বই পড়ে শিখে নিতে হবে। যেকোনো মানুষেরই সে ক্ষমতা আছে।

কেউ কেউ আবার কম্পিউটার সায়েন্সের কোর্স-কারিকুলামকে দায়ী করে। এটা কিছুটা হলেও সত্য যে বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের বেশ কিছু তাত্ত্বিক কোর্স ইন্ডাস্ট্রিতে সরাসরি কাজে লাগে না, কিন্তু ওগুলো টেক প্রফেশনাল হিসেবে আমাদের ভিত্তি গড়ে দেয়। গাড়ি চালাতে এর ইঞ্জিন কিভাবে কাজ করে জানা লাগে না ঠিকই, কিন্তু সেটা জানা থাকলে বিপদে যেমন কাজে আসে, তেমনই গাড়িকে দীর্ঘদিন ভালভাবে মেইনটেইন করা যায়।

টেক ইন্ডাস্ট্রির একটা চরম সত্যবচন হচ্ছে – কোম্পানিগুলো মুখে যাই বলুক, এদের মূল লক্ষ্য কিন্তু হচ্ছে ব্যবসা করা। ফ্রেশারদের শুণ্য থেকে শেখানোর মৌলিক দায়িত্ব কোম্পানিগুলোর না, বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা চায় ভাল কাজ পারে এমন কর্মীদের নিয়োগ দিয়ে ঘরে মুনাফা তোলা।

মনে রাখতে হবে – Workplace is not the place to learn from scratch, it’s a place to grow from what you already have.

২) লজিক্যাল প্রবলেম সমাধান করতে পারতে হবে

আমি এখানে ফ্যান্সি বা অ্যাডভান্সড এলগোরিদমের কথা বলছি না – যেমন DFS, BFS, গ্রাফ ট্র্যাভারসাল, ইত্যাদি। আমি বলছি “কমন সেন্স” সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারার ক্ষমতা থাকতে হবে। কিছু উদাহরণ দিচ্ছিঃ

ক) একটা সংখ্যা প্রাইম কি না
খ) একটা সংখ্যা দুটি প্রাইম সংখ্যার গুণফল কি না
গ) একটা ইনটিজার অ্যারে বা লিস্ট থেকে সবচেয়ে ছোট (বা বড়) সংখ্যাটি বের করা (বিল্ট-ইন ফাংশান ব্যবহার না করে)
ঘ) একটা ইনটিজার অ্যারের সব সংখ্যাগুলোকে সর্ট করা (বিল্ট-ইন ফাংশান ব্যবহার না করে)

 
এই অতি সাধারণ সমস্যাগুলো কেউ যদি খুব দ্রুত যেকোন প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজে সমাধান করতে না পারে, তবে বুঝতে হবে সে খুবই পিছিয়ে আছে। বেশিরভাগ ইন্টারভিউতেই ব্যর্থ হবার সমূহ সম্ভাবনা।

আমি মনে করি চার বছরের ডিগ্রী অর্জনকারী যে কোন কম্পিউটার সায়েন্স গ্র্যাজুয়েটের এইধরনের বেসিক কম্পিউটিং সমস্যাগুলো অবশ্যই খুব দ্রুততার সাথে সমাধানের ক্ষমতা থাকতে হবে। এরজন্য প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণে চর্চা।

কেউ যদি এগুলো সহজেই পারতে শুরু করে, তখন পরবর্তী ধাপ হিসেবে আরেকটু জটিল সমস্যাগুলো চেষ্টা করতে হবে। একটা উদাহরণ দিচ্ছিঃ

একটা ইনটিজার অ্যারেতে কিছু র‍্যান্ডম নাম্বার আছে। এর মধ্যে থেকে এমন দুটো নাম্বার খুঁজে বের করতে হবে যাদের ব্যবধান (Difference) অন্য সব জোড়াসমূহের ব্যবধানের চেয়ে বড়, এবং সেই ব্যবধানের মান প্রিন্ট করতে হবে (জোড়াটি নয়)।

এই সমস্যাটির সমাধান অনেক কঠিনভাবে করা যায়, কিন্তু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে এটি আসলে অতি সরল একটা সমস্যা, মাত্র কয়েক লাইন কোডেই এটা সমাধান করা সম্ভব।

কেউ যদি এগুলোও সহজে পেরে যায়, তার জন্য আবশ্যক হবে অ্যাডভান্সড এলগোরিদম লাগে এমন সব সমস্যাগুলোতে হাত দেয়া।

রিকার্শন (Recursion) খুব ভালো মত বুঝতে হবে, এবং বিভিন্ন প্রবলেমে যথাযথ ভাবে কাজে লাগাতে পারতে হবে।

এসবের পাশাপাশি সাধারণ ডেটা স্ট্রাকচারগুলোর জ্ঞান থাকাটাও জরুরি – যেমন লিঙ্কড লিস্ট, ট্রি, ইত্যাদি।

৩) অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রামিং (OOP) ছাড়া গতি নাই

OOP খুব ভাল মত না বুঝলে এবং ব্যবহার না করতে পারলে প্রোগ্রামার হিসেবে চাকরির আশা বাদ দিতে হবে। কথা শেষ!

আমি যখন কারো ইন্টারভিউ নেই, এবং দেখি সে পলিমর্ফিজম বা ইনহেরিটেন্স টার্মগুলোর সাথে পরিচিত না, বা ওভারলোডিং এবং ওভাররাইডিং এর পার্থক্য জানে না, আমি সাথে সাথে ইন্টারভিউ বন্ধ করে দেই। বিষয়গুলো জানা এতটাই গুরুত্বপুর্ণ।

যেকোন সমস্যাকে শুধুমাত্র ফাংশন দিয়ে চিন্তা না করে, অবজেক্ট দিয়ে সাজাতে পারাটা এখন অতি জরুরী একটা ইন্ডাস্ট্রি রিকোয়্যারমেন্ট।

নিচের C# কোড স্নিপেটটা দেখা যাকঃ

public class A
{

}
public class B : A
{

}
A a = new B();
B b = new A();

 
এখানে একটা লাইন কম্পাইল-টাইম এরর দিবে, কারন সেখানে এক্সপ্লিসিট কাস্টিং (explicit type casting) করা হয়নি। প্রোগ্রামার হিসেবে চাকরি প্রার্থী যেকারোরই জানা থাকা দরকার সেটি কোন লাইন।

৪) যেকোন একটা প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজে জোরালো দক্ষতা

বেশিরভাগ ফ্রেশারদেরই একাধিক প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজে অল্প অল্প জ্ঞান থাকে। সেটা ঠিক আছে। কিন্তু অন্তত একটা ল্যাঙ্গুয়েজে গভীর পারদর্শিতা থাকাটা আবশ্যক। সেটা C++ হতে পারে, C#, জাভা, PHP ইত্যাদি OOP সাপোর্ট করে এমন যেকোন ল্যাঙ্গুয়েজই হতে পারে।

ন্যূনতম একটি প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজে সম্পুর্ণ দখল না থাকাটা ইন্ডাস্ট্রির চোখে বড়ধরণের দূর্বলতা হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে।

যেমন, কাউকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় কোন ল্যাঙ্গুয়েজে সে সবচেয়ে সাবলীল, এবং এর উত্তর যদি হয় C++, এরপর পয়েন্টার কি সেটা যদি ভালমত ব্যাখ্যা করতে না পারে, তাহলে সেখানেই তার চাকরির আশা খতম।

৫) SQL পারতে হবে

অনেক ফ্রেশারদেরই গেম বানাতে যত না ভাল লাগে, ডেটাবেজ অ্যাপ্লিকেশন বানাতে ততটা ভাল লাগে না। আবার আজকাল অনেক প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজে ORM এবং অন্যান্য হাই-লেভেল কোয়্যারি টেকনোলজির কারনে SQL এর প্রয়োজনও পরে না।

তারপরেও আমি মনে করি, বেসিক SQL সব প্রোগ্রামাদেরই জানা থাকা জরুরী। বিশেষ করে গ্রুপিং ও জয়েন অপারেশনগুলোতে দক্ষতার দরকার আছে।

ধরা যাক, নিচের মত দুটো ডেটাবেজ টেবিল আছে।

ClassRecords:

ID StudentID SubjectID
1 1 1
2 1 3
3 1 2
4 2 1
5 3 2
6 3 3
7 4 1

Subjects:

ID Subject
1 English
2 Bengali
3 Math

 
এখন যদি বলা হয় এমন একটা SQL কোয়্যারি লেখ যা দিয়ে সেইসব স্টুডেন্ট আইডি আউটপুট হিসেবে বেরিয়ে আসবে যারা সব সাবজেক্ট নিয়েছে, তোমরা কি পারবে?

৬) ওয়েব এর বেসিক জ্ঞান

আমার মনে হয় টুকটাক ওয়েব ডেভেলপমেন্ট এর জ্ঞান আজকাল বেশিরভাগ ফ্রেশারদেরই থাকে। কারো কারো বেশ ভাল পরিমাণেই এটা আছে।

ওয়েব ডেভেলপমেন্ট এর ৩টা প্রধান কম্পোনেন্টঃ

  • HTML
  • CSS
  • Javascript

 
আবার Javascript এর জনপ্রিয় একটা লাইব্রেরি হচ্ছে jQuery।

এই জিনিসগুলো যত ভাল জানবে, ওয়েব নিয়ে কাজ করে এমন সব কোম্পানিতে (যেমন আমরা) চাকরির সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যাবে।

যেমন,
ক) নতুন HTML5 ইলিমেন্টসগুলোর সাথে পরিচয় আছে কি না
খ) CSS3 এর নতুন ফিচারগুলো জানা আছে কি না
গ) Javascript বা jQuery দিয়ে ডম ম্যানিপুলেশন করতে পারো কি না
ইত্যাদি।

 
একটা উদাহরণ প্রশ্নঃ CSS এ display: none আর visibility: hidden এর মধ্যে পার্থক্য কি তা কি তোমরা জানো?

৭) মোবাইল অ্যাপস ডেভেলপমেন্ট এর সাথে পরিচিতি

আজকাল আমাদের দেশে বিশাল সংখ্যক কোম্পানি মোবাইল অ্যাপস ডেভেলপমেন্টের সাথে জড়িত। তাই যেকোন মোবাইল অ্যাপস ডেভেলপমেন্ট প্ল্যাটফর্মের (যেমন iOS, Android বা হাইব্রীড) প্র্যাকটিক্যাল জ্ঞান থাকলে চাকরি যোগাড় করতে খুবই সহায়ক হবে।

৮) ডিজাইন প্যাটার্ন জানা থাকলে পোয়া বারো!

আমি নিশ্চিত আমাদের দেশের ৬০% ফ্রেশার ডিজাইন প্যাটার্নের নাম কখনো শুনেনি। অথচ এটা যে কতটা শক্তিশালী এক জ্ঞান, সেটা যারা জানে তারাই ভাল বোঝে।

একজন ফ্রেশার যদি কয়েকটা ডিজাইন প্যাটার্ন জানে এবং বিভিন্ন সমস্যায় সে ইফেক্টিভলি ওগুলো ব্যবহার করে থাকে, এর মানে হচ্ছে তার চাকরি প্রায় নিশ্চিত!

ডিজাইন প্যাটার্ন শেখার বিভিন্ন রিসোর্স অনলাইনে প্রচুর পরিমাণে আছে।

৯) পড়ার অভ্যাস বজায় রাখতে হবে

আমি সব শিখে ফেলেছি, আর কিছু শিখতে হবে না – এই চিন্তা থাকলে প্রোগ্রামিং ক্যারিয়ারের সেখানেই সমাপ্তি। টেক ইন্ডাস্ট্রিতে শেখার কোন শেষ নাই। তুমি যেই হও, যত বছরের অভিজ্ঞতাই থাকুক, যেদিন তুমি নতুন কিছু শেখা বন্ধ করবে সেদিন থেকেই তুমি বিলুপ্তির পথে পা বাড়ালে।

প্রতিদিনই নতুন নতুন টেকনোলজি, টেকনিক, ল্যাঙ্গুয়েজ, লাইব্রেরি রিলিজ পাচ্ছে। তাই প্রতিদিনই আমাদের কিছু সময় পড়ার ও জানার জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে, এবং যেগুলো ভাল মনে হবে সেগুলো দ্রুত আয়ত্তে আনতে হবে।

পছন্দের কিছু টেক ব্লগ তোমার ব্রাউজারে বুকমার্ক করে রাখো, এবং প্রতিদিন চোখ বুলাও।

ইন্ডাস্ট্রি গুরুদের ফলো করো, এবং তারা কি কাজ করছে বা লিখছে সেটা জানার চেষ্টা কর।

এই প্র্যাকটিসগুলো খুবই কাজে দেবে।

১০) দরকার একটা ভালো সিভি (CV)

আগেই বলেছি যে আমাদের কোম্পানিতে প্রতিটা জব অ্যাপ্লিকেশনের বিপরীতে গড়ে ২০০০টা করে সিভি পড়ে। সেইসব সিভি দেখতে দেখতে আমার রাগে দুঃখে মাথার চুল ছিড়তে ইচ্ছা করে। রীতিমত কান্না পায়।

বেশিরভাগ সিভিই অত্যন্ত সাদামাটা, বলা যায় একে অপরের ডুপ্লিকেট। ১০০টা সিভি যদি হুবুহু একই রকম হয়, তাহলে সেখান থেকে একজন আমি বেছে নেবো কি করে? প্রতিটা মানুষের মতো তাদের সিভিও হওয়া উচিৎ অনন্য ও ভিন্ন।

আমি প্রথমেই দেখি সিভিতে কয়টি প্রোজেক্ট করার কথা আছে। ফ্রেশারদের সিভিতে প্রফেশনাল প্রোজেক্ট থাকবে না, সেটাই স্বাভাবিক কিন্তু প্রচুর পরিমাণে অ্যাকাডেমিক ও শখের (মানে পেট) প্রোজেক্ট থাকাটা ভাল।

এবং প্রোজেক্টগুলো যত মজার বা ইন্টারেস্টিং হবে, চাকরিপ্রার্থীর গ্রহনযোগ্যতা তত বেশি হবে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ কম্পিউটার সায়েন্স গ্র্যাজুয়েটদের সিভিতে দেখি তারা লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বানিয়েছে। এই বিরক্তিকর কপি-পেস্ট প্রোজেক্ট দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত। একজন শিক্ষার্থী বা ফ্রেশার যদি ১-২ মাস পর পর একটা করে ছোট কিন্তু মজার পেট প্রোজেক্ট বানায় তাহলেই তো সিভি ভারি হয়ে যায়!

কিছু মজার প্রোজেক্ট এর উদাহরণ দিচ্ছি যা একজন প্রোগ্রামারের পক্ষে বানানো সম্ভবঃ

ক) ফেইসবুকে চারজন মিলে খেলার মত লুডু গেম
খ) মোবাইলের জন্যে একটা ডেইলি টুডু লিস্ট অ্যাপ, সাথে রিমাইন্ডার ফিচার
গ) ছোট্ট এক পেজের একটা ওয়েবসাইট যেখানে গেলে প্রতিদিন কুর’আন / হাদিস / অন্য কোন ধর্মগ্রন্থের র‍্যান্ডম একটা বাণী দেখাবে
ইত্যাদি…

 
এই শখের প্রোজেক্টগুলো বানাতে গেলে টেকনোলজি যেমন শেখা হবে, তেমনই সিভিটির আকর্ষণও কোম্পানিগুলোর কাছে বাড়বে।

প্রোজেক্টের পর আমি দেখি প্রার্থীর প্রোগ্রামিং কনটেস্ট এ অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা আছে কি না, থাকলে সাফল্যের হার কেমন।

টপকোডারের মত অনেক ওয়েবসাইটেও এখন কনটেস্ট করা যায়, যে যত বেশি সমস্যার সমাধান করেছে তার র‍্যাঙ্ক তত ভাল। আর ভাল র‍্যাঙ্কিং এর একজন প্রোগ্রামারের চাকরি পাওয়া কোন ব্যাপার না।

কম্পিউটার সায়েন্স গ্র্যাজুয়েটদের উচ্চ সিজিপিএ থাকাটা প্রোগ্রামার পদে চাকরি পাওয়ার জন্য খুব একটা জরুরী না। তবে ৩.৭৫ এর উপরে সিজিপিএ থাকলে আলাদা কথা।

ফ্রেশারদের সিভিতে এই তিনটি ফ্যাক্টরের বাইরে আর কিছু দেখার নাই। তোমার ইউনিভার্সিটিতে কি কি কোর্স ছিলো, বা কোন এক্সট্রাকারিকুলার অ্যাক্টিভিটিতে তুমি ভাল, তাতে সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর কিছু যায় আসে না।

আকর্ষনীয় একটা সিভির পাশাপাশি গোছানো ও আপডেটেড লিঙ্কড-ইন প্রোফাইল থাকাটা বেশ কাজের। ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট বা ব্লগ থাকলে এবং সেখানে নিজের টেকনিক্যাল লেখালেখি থাকলে তো অসাধারণ।

রবিনের মতো যারা পাশ করে মাসের পর মাস ঘরে বসে আছো তারা উপরে ১০টা পন্থা অনুসরণ করলে ইন্টারভিউতে অবশ্যই ডাক পাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। ঘরে বসে সময়টা শুধুশুধু অপচয় না করে, নতুন কোন টেকনোলজি শিখে ফেলা বা দু’একটা প্রোজেক্ট বানানো সৃষ্টির সেরা জীবের জন্য কঠিন কিছু হওয়ার কথা না। আর করতে পারলে কর্মসংস্থান অনিবার্য।


লেখকঃ হাসনাইন রিজভী রহমান
সিইও, আস্থা আইটি (বাংলাদেশ)
সিটিও, সুপারগীকস (আমেরিকা)

Comments

comments